
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কার্যক্রম—বিশেষত তৈরি পোশাক শিল্পের-নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা শুরু করার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
রোববার ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স (ইউরোচেম)-এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে তিনি এ বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রত্যাহার হলেও যেন বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সে জন্য আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। জাপানের সঙ্গে সদ্য স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (ইপিএ) উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান, এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ইইউর সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় সরকার।
ইউরোচেম চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বলেন, এফটিএ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানান, ২০২৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান বাণিজ্য সুবিধা বহাল থাকবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বৈঠকে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্ক সহজীকরণ এবং প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার নিয়ে আলোচনা হয়। পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, বিশেষ করে ইইউ পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও মতবিনিময় করা হয়।
অধ্যাপক ইউনূস জানান, জাপানের সঙ্গে ইপিএ চুক্তির ফলে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩০০টির বেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। তিনি বলেন, এ সাফল্য বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে এবং একই মডেলে ইইউসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আলোচনা এগিয়ে নিতে আগ্রহী সরকার।
নুরিয়া লোপেজ বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ইউরোপীয় বাজারে বিদ্যমান বাণিজ্য সুবিধা হারাতে পারে, তাই এখনই এফটিএ নিয়ে আলোচনায় বসা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশ ইতোমধ্যে ইইউর সঙ্গে এ ধরনের চুক্তির মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করেছে। ইউরোচেম ইউরোপীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ-ইইউ বাণিজ্য সম্পর্কের ধরনে পরিবর্তন আসবে, যদিও তা ২০২৯ সালের আগে কার্যকর হবে না। প্রায় ২০ কোটি মানুষের বাজার হিসেবে বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরে ইইউ আগ্রহী বলেও তিনি জানান। এ লক্ষ্যে ২০২৬ সালে একটি ইইউ-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম আয়োজনের প্রস্তুতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কারখানা স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য। দক্ষ শ্রমশক্তি ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় দেশের বড় শক্তি। তিনি জানান, বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলছে।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে ইইউর বৃহৎ পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ইইউ পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে আস্থার প্রতীক। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী প্রচারের সামগ্রিক পরিবেশ এখন পর্যন্ত ইতিবাচক রয়েছে।
বৈঠকে সরকারের এসডিজি সমন্বয়ক ও সিনিয়র সচিব লামিয়া মোরশেদও উপস্থিত ছিলেন।













